আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র
-
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭) বাংলা সাহিত্যের এমন একজন লেখক, যিনি সংখ্যায় খুব কম লিখলেও মানের বিচারে বিশ্বসাহিত্যের সমপর্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তার 'আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র' মূলত দুই খণ্ডে বিন্যস্ত, যা একজন সিরিয়াস পাঠকের জন্য অমূল্য সম্পদ।
তার লেখায় উঠে আসে পুরান ঢাকার অলিগলি, নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম, তেভাগা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মোহ ও রূঢ় বাস্তবতা।
নিচে তার রচনাসমগ্রের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
ইলিয়াস মাত্র দুটি উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু এই দুটিই বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে:
চিলেকোঠার সেপাই: ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে লেখা। এটি কেবল রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, বরং গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের এক মহাকাব্য। 'হাড় কাঁপানো শীতে' ওসমানের ডাল ভাতের সংগ্রাম থেকে শুরু করে খিজিরের তেজি স্বভাব—সবই এতে জীবন্ত।
খোয়াবনামা: উত্তরবঙ্গের প্রেক্ষাপটে তেভাগা আন্দোলন, দেশভাগ এবং ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের লোকগাঁথা নিয়ে রচিত। এটি একটি 'ম্যাজিক রিয়ালিজম' সমৃদ্ধ উপন্যাস যেখানে ইতিহাস ও কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
ইলিয়াসের ছোটগল্পগুলো সমাজের ভণ্ডামি এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে। তার বিখ্যাত পাঁচটি গল্পগ্রন্থ হলো:
১. অন্য ঘরে অন্য স্বর
২. খোঁয়ারি
৩. দুধভাতে উৎপাত
৪. দোজখের ওম
৫. জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল
তার উল্লেখযোগ্য কিছু গল্পের মধ্যে রয়েছে: 'রেইনকোট' (মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক), 'ফোঁড়া', 'কান্না', এবং 'পায়ের নিচে জল'।
তার রচনাসমগ্রের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তার তীক্ষ্ণ ও যুক্তিপূর্ণ প্রবন্ধ। 'সংস্কৃতির ভাঙা সেতু' বইটিতে তার সমাজচিন্তা ও সাহিত্যভাবনা ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করতেন, ড্রয়িংরুমে বসে সাহিত্য হয় না, তার জন্য মানুষের মাটির কাছাকাছি যেতে হয়।
ডিটেইলিং: তিনি কোনো দৃশ্য বা পরিস্থিতির এমন নিখুঁত বর্ণনা দেন যে পাঠক সেটা চোখের সামনে দেখতে পান।
ভাষাশৈলী: পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা এবং উত্তরবঙ্গের উপভাষার ব্যবহারে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।
রূঢ় বাস্তবতা: তিনি মেকি ভদ্রতা পছন্দ করতেন না; মানুষের কাম, ক্রোধ, লোভ এবং নগ্ন বাস্তবতাকে তিনি সপাটে তুলে ধরতেন।
আপনি যদি স্রেফ বিনোদনের বাইরে গিয়ে সমাজ ও মানুষের গভীরে ডুব দিতে চান, তবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অপরিহার্য। তার লেখা পড়লে বোঝা যায়, কেন তাকে 'লেখকদের লেখক' বলা হয়।
একটি তথ্য: ১৯৯৬ সালে তিনি 'খোয়াবনামা'র জন্য আনন্দ পুরস্কার এবং পরে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।