সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী
সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল প্রতিভা, যাঁকে বলা হয় 'পণ্ডিতমশাই' আর 'রসিকরাজ'-এর এক অদ্ভুত মিশেল। তাঁর 'রচনাবলী' কেবল বইয়ের সংকলন নয়, বরং এটি বিশ্বভ্রমণ, বহুভাষাবিদ্যা এবং অসামান্য রসবোধের এক মহাসাগর।
সাধারণত বিশ্বভারতী বা গাজল পাবলিশার্স থেকে তাঁর রচনাবলী ১২টি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্যের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রম্যরচনা ও ভ্রমণকাহিনি (সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ)
মুজতবা আলী মূলত তাঁর ভ্রমণকাহিনির জন্য অমর হয়ে আছেন। তাঁর বর্ণনায় ভূগোল কেবল মানচিত্র থাকে না, তা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
দেশে-বিদেশে: এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ। আফগানিস্তানের কাবুল প্রবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা এই বইটি বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা ভ্রমণকাহিনিগুলোর একটি। এর 'আবদুর রহমান' চরিত্রটি আজও পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
জলে-ডাঙায়: জাহাজযোগে ইউরোপ যাত্রার এক মজাদার ও তথ্যবহুল বর্ণনা।
মুসাফির: বিচিত্র দেশ ও মানুষের গল্প।
২. পাণ্ডিত্য ও বহুভাষাবিদ্যা
তিনি ১৫টি ভাষা জানতেন এবং তাঁর লেখায় অত্যন্ত অবলীলায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান শব্দের ব্যবহার করতেন। তাঁর লেখায় যেমন থাকে সূক্ষ্ম কৌতুক, তেমনই থাকে ইতিহাসের গভীর জ্ঞান।
পঞ্চতন্ত্র (১ম ও ২য় খণ্ড): তাঁর অসাধারণ সব রম্য প্রবন্ধের সংকলন। সমসাময়িক রাজনীতি থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুই তিনি ব্যঙ্গ ও যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করেছেন।
ময়ূরকণ্ঠী: রসবোধ ও মননশীলতার এক অনন্য উদাহরণ।
৩. উপন্যাস ও ছোটগল্প
মুজতবা আলীর উপন্যাসগুলো প্রথাগত উপন্যাসের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের, যেখানে দর্শনের ছোঁয়া প্রবল।
অবিশ্বাস্য: তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস।
শবনম: লিরিক্যাল বা কাব্যিক গদ্যে লেখা এক অনন্য প্রেমের উপন্যাস, যার পটভূমি আফগানিস্তান।
শহর-ই-ইয়ার: নাগরিক জীবনের প্রেক্ষাপটে লেখা।
চাচা কাহিনী: 'চাচা' নামক এক কাল্পনিক ও চিরতরুণ চরিত্রের মুখ দিয়ে বলানো একগুচ্ছ চমৎকার ও মজাদার গল্পের সংকলন।
৪. ভাষা ও রচনারীতি
আড্ডার মেজাজ: তাঁর লেখা পড়লে মনে হয় কোনো অতি শিক্ষিত ও রসিক মানুষ আপনার সামনে বসে আড্ডা দিচ্ছেন।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারতা: তিনি সংকীর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর লেখায় সূফিবাদ ও বৈষ্ণব দর্শনের এক চমৎকার সমন্বয় পাওয়া যায়।
কেন মুজতবা আলী রচনাবলী আপনার সংগ্রহে রাখা উচিত?
১. বিশ্বদর্শন: ঘরে বসেই সারা পৃথিবীর সংস্কৃতি, খাবার এবং মানুষের স্বভাব সম্পর্কে জানতে পারবেন।
২. ভাষার দখল: বাংলা ভাষাকে কতভাবে অলংকৃত করা যায়, তা তাঁর লেখা না পড়লে বোঝা অসম্ভব।
৩. মানসিক প্রশান্তি: ঘোরতর বিষণ্ণতার দিনে তাঁর যেকোনো একটি রম্যরচনা আপনার মুখে হাসি ফোটাতে বাধ্য।
একটি বিশেষ তথ্য: শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যেমন তাঁর লেখায় আছে, তেমনই তিনি নিজের এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছিলেন যা 'মুজতবা-শৈলী' নামে পরিচিত।