রশীদ করিমের 'উপন্যাস সমগ্র'
রশীদ করিম (১৯২৫–২০১১) বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক মনস্ক ঔপন্যাসিক। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা উপন্যাসের চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে নগরজীবনের জটিল মনস্তত্ত্ব, মধ্যবিত্তের অবদমন এবং অস্তিত্ববাদী সংকটের কথা বলে।
রশীদ করিমের 'উপন্যাস সমগ্র' বা তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলো নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. রশীদ করিমের উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য
নগরকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্ব: তাঁর উপন্যাসের পটভূমি মূলত কলকাতা (দেশভাগের আগে) এবং ঢাকা। শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের কৃত্রিমতা, যৌনতা ও একাকীত্ব তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
অস্তিত্ববাদী চেতনা: তাঁর চরিত্রগুলো অনেক সময় নিজের অস্তিত্ব ও চারপাশের জগতের অসারতা নিয়ে গভীর সংকটে ভোগে। এটি বাংলা সাহিত্যে তাঁর লেখাকে একটি বিশেষ উচ্চতা দিয়েছে।
গদ্যেরীতি: তাঁর গদ্য অত্যন্ত মার্জিত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং ব্যঙ্গাত্মক। তিনি ঘটনার চেয়ে চরিত্রের মনোজগৎকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
২. উল্লেখযোগ্য উপন্যাসসমূহ
তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই এক একটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল। প্রধান কয়েকটি হলো:
উত্তম পুরুষ: এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত। একজন মানুষের জীবনের সাফল্য, হতাশা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন—বিশেষ করে এক প্রৌঢ়ের মানসিক জগত নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন।
আমার যত গ্লানি: এই উপন্যাসে তিনি সমকালীন সমাজের ভণ্ডামি ও মানুষের ভেতরের গ্লানিকে খুব নির্মমভাবে উন্মোচন করেছেন।
পদসঞ্চার: এটি মূলত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা, তবে এখানেও ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রবল।
প্রেয়সী: প্রেমের নামে যে অবদমন ও অধিকারবোধ কাজ করে, তার এক তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ এই উপন্যাস।
সহস্র রজনী: নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা ও প্রেমের জটিলতা এখানে উঠে এসেছে।
৩. রশীদ করিম কেন পাঠ্য?
আপনি যদি এমন কোনো সাহিত্য পড়তে চান যা কেবল গল্প নয়, বরং মানুষের মনের গভীরে থাকা অন্ধকার ও আলোকরশ্মিকে স্পর্শ করে, তবে রশীদ করিম অপরিহার্য। তিনি বাংলা উপন্যাসের শরীরে আধুনিকতার যে ছোঁয়া দিয়েছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
৪. প্রাপ্তিস্থান ও সংগ্রহ
রশীদ করিমের রচনাবলি বা উপন্যাস সমগ্র বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে একাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। আপনি যদি তাঁর লেখা পড়তে আগ্রহী হন, তবে লাইব্রেরিতে 'রশীদ করিম উপন্যাস সমগ্র' খোঁজ করলেই পাবেন। বিশেষ করে 'উত্তম পুরুষ' উপন্যাসটি দিয়ে পড়া শুরু করা সবচেয়ে ভালো।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: রশীদ করিম পেশাগত জীবনে একজন সফল ব্যাংকার ছিলেন। ব্যাংকিং জীবনের কঠোর নিয়মের ভেতর থেকেও তিনি যেভাবে মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ধরেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

