মতিচুর
‘মতিচুর’ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লেখা একটি কালজয়ী প্রবন্ধ গ্রন্থ। এটি দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল (প্রথম খণ্ড ১৯০৪ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯২২ সালে)। বাংলা সাহিত্যে নারী জাগরণ, সমাজ সংস্কার এবং যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারে এই গ্রন্থটি একটি মাইলফলক।
বইটির মূল বিষয়বস্তু এবং গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নারী জাগরণের ইশতেহার
‘মতিচুর’ গ্রন্থে বেগম রোকেয়া অত্যন্ত সাহসের সাথে তৎকালীন মুসলিম সমাজে নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণগুলো তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, নারীদের বন্দি করে রাখা এবং শিক্ষার সুযোগ না দেওয়া কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া একটি সামাজিক কুপ্রথা।
২. উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধসমূহ
এই গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধই শাণিত যুক্তিতে ভরপুর। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হলো:
স্ত্রীজাতির অবনতি: এই প্রবন্ধে তিনি নারীদের অলঙ্কারকে ‘দাসত্বের চিহ্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অর্ধাঙ্গী: এখানে তিনি সমাজকে একটি গাড়ির সাথে তুলনা করেছেন, যার চাকা হলো নারী ও পুরুষ। এক চাকা ছোট বা অকেজো হলে যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি নারীদের অশিক্ষিত রেখে সমাজ এগোতে পারে না।
গৃহ: এই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন যে, ঘর সবার জন্য নিরাপদ আশ্রয় হলেও নারীদের নিজস্ব কোনো ‘গৃহ’ বা কর্তৃত্ব নেই।
সুগৃহিণী: আদর্শ গৃহিণী হওয়ার জন্য কেবল রান্নাবান্না নয়, বরং শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
৩. রসবোধ ও তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ
বেগম রোকেয়ার লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর ‘হিউমার’ বা সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ। তিনি অত্যন্ত সহজ ও সরস ভাষায় সমাজের গোঁড়ামি এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে আক্রমণ করেছেন। তাঁর বিদ্রূপাত্মক ভাষা পাঠককে হাসায়, আবার গভীরভাবে ভাবিয়েও তোলে।
৪. সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার
তিনি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যারা নারীদের অবদমিত করে রাখত, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত ইসলাম ধর্ম নারীদের যে অধিকার দিয়েছে, সমাজ তা কেড়ে নিয়েছে।
কেন ‘মতিচুর’ আজও প্রাসঙ্গিক?
যৌক্তিক চিন্তা: এটি কেবল আবেগের কথা নয়, বরং যুক্তি দিয়ে অধিকার আদায়ের কথা বলে।
শিক্ষার গুরুত্ব: একশ বছর আগে লেখা হলেও আজীবন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর দর্শন আজও অটুট।
আত্মপরিচয়: নারীদের নিজস্ব সত্তা ও আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করতে এই বইটি প্রেরণা জোগায়।

